দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একটার পর একটা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটছে — গার্মেন্টস কারখানা, কনটেইনার ডিপো, বিমান কার্গো ঘর এবং শিল্পগুদামে আগুন লাগার খবর যেন থেমে নেই। প্রতিটি দুঃসংবাদের পেছনে লুকিয়ে আছে একই প্রশ্ন — এ সব কেবল দুর্ঘটনা, নাকি কেউ কিছু লুকাতে আগুন লাগাচ্ছে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঢাকার ও চট্টগ্রামের কয়েকটি বড় আগুনের ঘটনা সম্পর্কে নিরাপত্তা ও শিল্পবিশ্লেষকরা উদ্বেগপ্রকাশ করেছেন। বড় অঙ্কের ক্ষয়ক্ষতি, নথি ও মালামাল ধ্বংস, এবং অগ্নি নিরাপত্তার নিয়মাবলীর একাধিক লঙ্ঘনের প্রবল মার্কা—সব মিলিয়ে প্রশ্নের সংখ্যা বেড়েই চলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—অনেক ক্ষেত্রে আগুন লাগার কারণগুলো সরাসরি টেকনিক্যাল: বৈদ্যুতিক শর্ট, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক স্টোরেজ বা পুরনো অবকাঠামোর দুর্বলতা। তবে তদন্তকারী দলগুলো মাঝে মাঝে এমন অনিয়মও খুঁজে পান যা “অব্যাহত দুর্ঘটনা” থেকে এক ধাপে এগিয়ে বিভ্রান্তিকর। ফলে তদন্তের স্বচ্ছতা না থাকলে তদন্ত রিপোর্টও লোক পূর্বেই নিরাশ করে দেয়।
অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা ও বীমা খাতে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন—কোনো কোনো আগুনে নথি ধ্বংস, বীমা দাবির আশায় জাল নথি, কিংবা অবৈধ মালামাল ধ্বংস করার জন্য আগুন লাগানো হয়—এগুলো সার্সকুলার হলেও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করা জরুরি। কার্যত, প্রত্যেক বড় আগুনের ক্ষেত্রে “দুর্ঘটনা নয়” বলে স্থির বিবৃতি দেওয়া ঠিক নয়—কিন্তু সন্দেহ উটকে দিতে প্রয়োজন স্বাধীন ও পেশাদার তদন্ত।
শ্রমিকদের নিরাপত্তা সংগঠন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদনে ঘাটতি রয়ে গেছে—নিয়মিত অডিট, আগুন-নিরাপত্তা সরঞ্জাম, জরুরি নির্গমন পথ ও কর্মীদের প্রশিক্ষণের অভাবের কথা বারবার উঠে এসেছে। এছাড়া গুদাম ও কারখানাগুলোর লাইসেন্সিং ও নিয়মিত পরিদর্শনের তীব্র ত্রুটি রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে কতিপয় সংবাদ-ফুটেজে দেখা যায় আগুন লাগার পর দ্রুতই একপ্রকার নথি-ধ্বংস বা মালামালের ধ্বংস-দৃশ্য — যা প্রশ্নকে আরও জোরালো করে। বিষয়টি নিয়ে সিভিল সোসাইটি ও সংবাদমাধ্যম এখন দাবি তুলছে—প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডে স্বচ্ছ, সময়ানুবর্তী ও স্বাধীন ফরেনসিক তদন্ত করা হোক; তদন্তের ফল জনগণের কাছে প্রকাশ করতেই হবে।
সরকারি পর্যায়ে বলা হচ্ছে—আগুন নিয়ন্ত্রণে নতুন কৌশল, ডিটেক্টর ও আবশ্যকীয় নীতিমালা জোরদার করা হবে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন—নীতিমালাই যথেষ্ট নয়; বাস্তব প্রয়োগ, অনুশীলন ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে—নাহলে প্রতিটি নতুন বিজ্ঞপ্তি কাগজে মাথা নত করবে।
টিপুনিতে—এই আগুনগুলো কেবল অর্থ-সম্পদ নষ্ট করে না; হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা ও মানুষের নিরাপত্তা-ভরসাও প্রশ্নের মুখোমুখি করে। তাই এখন প্রয়োজন দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত, কড়াকড়ি বাস্তবায়ন এবং জনসম্মুখে প্রতিবেদন প্রকাশ—নাহলে বারবারের আগুনের তিনধাপীয় প্রশ্ন থাকবে: দুর্ঘটনা, অবহেলা নাকি ইচ্ছাকৃত লুকানো?
শেষ পরাবর্ষে একই প্রশ্ন রয়ে যায়—দেশটা কি শুধু আগুন নেভাতে ব্যস্ত থাকবে, নাকি আগুন লাগার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করে মূলেই বদল আনবে? জনগণের অধিকার হলো জেনে নেওয়া—কারণ আগুনে যা হারায়, তা আর ফিরে পাওয়া কঠিন।
Leave a comment