বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) তাদের মনোনয়ন তালিকায় দলীয় প্রয়াত, সাবেক ও বর্তমান নেতাদের সন্তানদের উল্লেখযোগ্য স্থান দিয়েছে। সাম্প্রতিক ঘোষণায় ২৩৭টি আসনের জন্য প্রকাশিত তালিকায় এসব নেতাদের ১৯ ছেলে এবং ৫ মেয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এছাড়া, দুই প্রয়াত নেতার স্ত্রীও মনোনয়ন পেয়েছেন। যদিও অনেকের ক্ষেত্রে পরিবারের পরিচয়ই প্রধান ভিত্তি, তবু এরা সকলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সক্রিয়তা দেখিয়েছেন।
নির্বাচনী প্রেক্ষাপট: বিএনপির কৌশল
গত সোমবার বিএনপি ২৩৭টি আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করে। বাকি ৬৩টি আসন এখনও অপ্রকাশিত, যার মধ্যে শরিক দলগুলোর সাথে আলোচনার পর কিছু আসন তাদের জন্য সংরক্ষিত হতে পারে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ইতিমধ্যে ২৯৮টি আসনের প্রার্থী জানিয়েছে, যখন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শীঘ্রই তাদের তালিকা প্রকাশ করতে পারে। বিএনপির তালিকায় প্রবীণ নেতাদের পাশাপাশি নবীন মুখগুলো রয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই দলীয় নেতাদের উত্তরসূরিরা।
প্রধান নেতাদের সন্তানদের মনোনয়ন: কয়েকটি উদাহরণ
বিএনপির তালিকায় পরিবারের উত্তরাধিকার স্পষ্ট। এখানে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম:
| আসন | প্রার্থী | পরিচয় |
|---|---|---|
| ঢাকা-৬ | ইশরাক হোসেন | সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে; ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব |
| চট্টগ্রাম-৭ | হুম্মাম কাদের চৌধুরী | মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে; কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য |
| চট্টগ্রাম-৫ | মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন | সাবেক মেয়র মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের ছেলে; কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক |
| ঢাকা-৪ | তানভীর আহমেদ রবিন | সাবেক এমপি সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে; ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব |
| চট্টগ্রাম-১৬ | মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী | সাবেক এমপি জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে; চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক |
| গাজীপুর-২ | এম মঞ্জুরুল করিম রনি | সাবেক সিটি মেয়র এম এ মান্নানের ছেলে; মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক |
| যশোর-৩ | অনিন্দ্য ইসলাম অমিত | সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ছেলে; খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক |
| পঞ্চগড়-১ | মোহাম্মদ নওশাদ জমির | সাবেক স্পিকার মুহম্মদ জমির উদ্দিনের ছেলে; আন্তর্জাতিক সম্পাদক |
| মৌলভীবাজার-৩ | এম নাসের রহমান | সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ছেলে; কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি সদস্য |
এছাড়া, গাজীপুর-৪, মানিকগঞ্জ-২, ময়মনসিংহ-৯, শেরপুর-২, শেরপুর-৩, কুষ্টিয়া-২, ঝিনাইদহ-৩, সিলেট-১, পিরোজপুর-২ এবং জয়পুরহাট-১ আসনেও নেতাদের সন্তানরা মনোনয়নপ্রাপ্ত। চট্টগ্রামে তিনজন প্রভাবশালী নেতার উত্তরসূরিরা নির্বাচিত হয়েছেন, যদিও কিছু ভারীওয়েট প্রার্থী বাদ পড়েছেন।
চট্টগ্রাম-৫ এর মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে দলের জন্য কাজ করে আসছি। দল যোগ্যতা দেখে মনোনয়ন দিয়েছে। বাবার পরিচয়ও নির্বাচনে সাহায্য করবে।”
নারী প্রার্থীদের মধ্যে পরিবারের ছাপ
তালিকায় মোট ১০ জন নারী রয়েছে, যাদের মধ্যে ৫ জনের বাবা দলীয় নেতা। উল্লেখযোগ্য:
- ফরিদপুর-২: শামা ওবায়েদ ইসলাম (সাবেক মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে; কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক)
- ফরিদপুর-৩: নায়াব ইউসুফ আহমেদ (সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের মেয়ে; মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক)
- মানিকগঞ্জ-৩: আফরোজা খানম রিতা (সাবেক এমপি হারুনার রশিদ খান মুন্নুরের মেয়ে; জেলা বিএনপির আহ্বায়ক)
- শেরপুর-১: সানসিলা জেবরিন (জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হযরত আলীর মেয়ে; যুগ্ম আহ্বায়ক)
- নাটোর-১: ফারজানা শারমিন পুতুল (সাবেক এমপি ফজলুর রহমান পটলের মেয়ে; জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক)
প্রয়াত নেতাদের স্ত্রীরা:
- সিলেট-২: তাহসিনা রুশদী (গুমের শিকার ইলিয়াস আলীর স্ত্রী; চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা)
- যশোর-২: সাবিরা সুলতানা (অপহৃত নাজমুল ইসলামের স্ত্রী; কেন্দ্রীয় সদস্য, উপজেলা সভাপতি)
- ঝালকাঠি-২: ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো (হত্যাকাণ্ডের শিকার সাবেক এমপির স্ত্রী; সাবেক এমপি)
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: উত্তরাধিকার না যোগ্যতা?
লেখক-গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “স্বাধীনতার আগে গ্রামীণ পরিবারগুলো ক্ষমতায় ছিল, পরে জাতীয় রাজনীতিতেও তাই হয়েছে। মুখে গণতন্ত্র বললেও চর্চা সামন্ততন্ত্রের – ফলে সমান সুযোগ নেই। যোগ্যতার পরীক্ষা হলে আরও দক্ষ নেতা উঠত।”
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ূম যোগ করেন, “পারিবারিক পরিচয় যোগ্যতার আড়ালে এলে সমস্যা। টাকা-উত্তরাধিকার বিবেচনায় দলের সাধারণ কর্মীরা বঞ্চিত হয়, রাজনীতিতে অসুস্থ প্রবণতা তৈরি হয়। প্রজন্ম বদলালে হবে না, রাজনীতির ধরন বদলাতে হবে।”
বিএনপি নেতারা যুক্তি দেন, এরা সকলে সক্রিয় রাজনীতিক এবং যোগ্য। তবে, অর্ধশতাধিক পরিবার-ভিত্তিক প্রার্থী মনোনয়ন চেয়েছিলেন, কিন্তু দলের নিয়মে এক পরিবার থেকে একজনকেই টিকিট দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ: ঢাকা-৩-এ গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে প্রাধান্য দিয়ে তার পুত্রবধূ নিপুন রায় চৌধুরী বাদ পড়েছেন। অবশিষ্ট ৬৩ আসনের মধ্যে ৯টিতেও নেতাদের সন্তানরা প্রত্যাশী।
দলের ভারসাম্য: অভিজ্ঞতা ও নতুন মুখ
তালিকায় ৮৩টি আসনে নতুন মুখ (ছাত্রনেতা, ডাক্তার, উকিল, প্রবাসী, স্থানীয় সংগঠক), যাদের মধ্যে ১০ জন সাবেক এমপিদের সন্তান এবং ২ জন স্ত্রী। ১৫১ জন অভিজ্ঞ প্রার্থী রয়েছে, যারা ২০১৮ নির্বাচনে লড়েছিলেন। এতে অভিজ্ঞতা বজায় রাখা এবং সহানুভূতির ভোট সংগ্রহের কৌশল স্পষ্ট।
বিএনপি নেতৃত্বের ঘোষণা: চেয়ারম্যান খালেদা জিয়া দিনাজপুর-৩, বগুড়া-৭ ও ফেনী-১ থেকে, অ্যাকটিং চেয়ারম্যান তারিক রহমান বগুড়া-৬ থেকে লড়বেন। সেক্রেটারি জেনারেল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর থাকুরগাঁও-১ থেকে।
চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা
চট্টগ্রামে নতুন মুখরা প্রাধান্য পেলেও কিছু ভারীওয়েট (যেমন বরিস্টার শাকিলা ফারজানা) বাদ পড়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি দলের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং জোট কৌশল নির্দেশ করে। তবে, পরিবারভিত্তিক মনোনয়ন রাজনীতির সামন্ততান্ত্রিক চেহারা তুলে ধরছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধি ও সাম্প্রতিক প্রতিবেদন।
Leave a comment