স্বাধীন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার টেকসই ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে প্রথম আলোর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো গোলটেবিল বৈঠক “বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সংস্কার: সুপারিশ, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ”। এতে অংশ নেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সদস্য, সম্পাদক, মালিক, শিক্ষক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি। আলোচনায় উঠে আসে—সুপারিশ জমা দেওয়ার আট মাস পরও তার বাস্তবায়নের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
“সুপারিশ জমা, কিন্তু কার্যকর হয়নি”—কামাল আহমেদ
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের অবসানের পর জনগণ যেমন গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন আশা করেছিল, সাংবাদিক সমাজও তেমনই একটি স্বাধীন পরিবেশ চেয়েছিল। কিন্তু আজও ‘মব–ভীতি’ ও রাজনৈতিক প্রভাব গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তিনি জানান, কমিশন প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে ১০৭টি সুপারিশ তৈরি করেছে, যার মধ্যে সাংবাদিকদের ন্যূনতম বেতন–ভাতা নিশ্চিত করা, স্বাধীন মিডিয়া কমিশন গঠন ও সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আশু করণীয় হিসেবে দেওয়া প্রস্তাবগুলোও এখনো সরকারের টেবিলেই পড়ে আছে।
মাহ্ফুজ আনাম: “স্বাধীন মিডিয়া কমিশন এখন সময়ের দাবি”
দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম বলেন, সংবাদমাধ্যমকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন রেখে প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, সাংবাদিক ইউনিয়নের রাজনৈতিক বিভাজনও স্বাধীন সাংবাদিকতার বড় অন্তরায়।
তার ভাষায়, “সাংবাদিক, সম্পাদক ও মালিক—সবার মধ্যে নৈতিকতা ও জবাবদিহি স্থাপন না হলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।”
গীতি আরা নাসরীন: “মিডিয়াকে একইসঙ্গে মুক্ত ও দায়বদ্ধ রাখতে হবে”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বলেন, কমিশনের সুপারিশগুলো অনেকেই না পড়ে মতামত দিচ্ছেন। তিনি জানান, সংবাদকর্মীদের মানসিক চাপ ও আর্থিক অনিশ্চয়তা সাংবাদিকতার গুণগত মানে প্রভাব ফেলছে।
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে।
এ কে আজাদ: “সংবাদপত্র টিকছে লোকসান দিয়ে”
নোয়াব সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, একটি পত্রিকার উৎপাদন খরচ যেখানে ২৫–২৮ টাকা, বিক্রি হয় ১০–১২ টাকায়। ৬০ শতাংশ পত্রিকা সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল। সরকারের কাছে ১০০ কোটি টাকার বেশি বকেয়া পাওনা রয়েছে।
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার অঙ্গীকার থাকতে হবে।”
রাজনৈতিক নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি
নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো দয়া নয়—এটা এক ধরনের আন্দোলন। রাজনৈতিক দলগুলোকে গণমাধ্যম সংস্কারের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।
বিএনপি নেতা মওদুদ হোসেন আলমগীর জানান, তাঁদের দলের ৩১ দফা রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার ঘোষণায় মিডিয়া কমিশন গঠনের অঙ্গীকার আগেই দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনায় সেটি বাস্তবায়ন করা হবে।
জামায়াতের মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যম—এই দুটি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে রাষ্ট্র টেকসই হয় না।
এনসিপির মুশফিক উস সালেহীন বলেন, সাংবাদিকদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে স্বাধীনতা অর্থহীন। তিনি বলেন, “আমরা সরকারের ভেতরে বা বাইরে থেকেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকব।”
মিডিয়ার অভ্যন্তরীণ সংকট
কমিশনের সদস্য কামরুন্নেসা হাসান বলেন, বিটিভি ও বেতারকে এখনো দলীয় প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তিনি চান, সরকারি গণমাধ্যমে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম রিজওয়ান উল আলম জানান, জরিপে মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ গণমাধ্যমকে সম্পূর্ণ স্বাধীন মনে করেন। তিনি বলেন, মূলধারা ও সোশ্যাল মিডিয়া একে অপরের সহযোগী শক্তি হতে পারে, প্রতিপক্ষ নয়।
বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বলেন, “আমরা বারবার আদর্শের কথা বলি, কিন্তু ব্যবহারিক সংস্কার হচ্ছে না।”
বিজেসি সভাপতি রেজওয়ানুল হক রাজা বলেন, সাংবাদিক ইউনিয়নের বিভাজন সাংবাদিকদের শক্তি ক্ষয় করেছে। “কমিশনের রিপোর্টের ভালো দিকগুলো অন্তত বাস্তবায়ন করা যেত,” তিনি মন্তব্য করেন।
এমআরডিআই পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, সরকার প্রেস কাউন্সিলেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে, অথচ কমিশনের প্রস্তাব ছিল স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন। তিনি জোর দেন স্বনিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক স্বচ্ছতার ওপর।
উপসংহার
আলোচনায় উপস্থিত সবাই একমত হন—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল আইনি বা কাঠামোগত নয়, এটি নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে যদি গণমাধ্যম সংস্কারের অঙ্গীকার স্থান পায়, তাহলে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নতুন দিগন্তে প্রবেশ করবে।
Leave a comment