পরিপক্ক সবজির চেয়ে অনেক বেশি পুষ্টিসমৃদ্ধ এই কচি চারাগুলোকে পুষ্টিবিদরা ‘সুপার ফুড’ বলে অভিহিত করছেন। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সীমিত জায়গায় সহজে উৎপাদন করা যায় বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরাও এর সম্ভাবনা দেখছেন।
রাসায়নিকের ছোঁয়া ছাড়াই পুষ্টির ভাণ্ডার
আধুনিক কৃষিতে অতিরিক্ত সার-কীটনাশকের ব্যবহার খাদ্যের গুণগত মান কমিয়ে দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সমাধান হিসেবে উঠে এসেছে মাইক্রোগ্রিনস। কোনো রাসায়নিক ছাড়াই ঘরের কোণায়, বারান্দায় বা ছাদে এটি চাষ করা সম্ভব।
পুষ্টিবিদদের মতে, পরিপক্ক সবজির তুলনায় মাইক্রোগ্রিনসে ভিটামিন সি, ই, কে, বিটা ক্যারোটিন এবং খনিজ পদার্থ প্রায় ৪ গুণ বেশি থাকে। এতে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পলিফেনল ও গ্লুকোসিনোলেট। ফলে এটি স্থূলতা, কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস্ট্রিক, রক্তাল্পতা, চুল পড়া – এমনকি লিভারের ডিটক্সিফিকেশনেও সহায়ক।
মাইক্রোগ্রিনস আসলে কী?
- বয়স: ৭-১৪ দিনের কচি চারা
- পর্যায়: স্প্রাউটসের পরবর্তী ধাপ, পূর্ণাঙ্গ সবজির আগের স্তর
- উদাহরণ: লালশাক, মুলা, ব্রকোলি, সরিষা, সূর্যমুখী, লেটুস ইত্যাদি
যখন বীজ থেকে প্রথম পাতা (কটিলিডন) বের হয়ে পুরোপুরি গঠিত হয়, তখনই এটি মাইক্রোগ্রিনস। এক সপ্তাহের মধ্যেই কাঁচা খাওয়ার উপযোগী হয়।
বাংলাদেশে যাত্রা শুরু
আশির দশকে ক্যালিফোর্নিয়ার রেস্তোরাঁয় সাজসজ্জা ও স্বাদ বাড়াতে শুরু হয় মাইক্রোগ্রিনসের ব্যবহার। পরে পুষ্টিগুণের কারণে ইউরোপ-আমেরিকায় জনপ্রিয়তা পায়।
বাংলাদেশে এর যাত্রা তুলনামূলক নতুন। করোনা মহামারির পর থেকে সচেতন মানুষের কাছে পৌঁছাতে শুরু করে। ২০২২ সালে ‘ওয়াটার অ্যান্ড প্লান্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ শুরু করে।
প্রতিষ্ঠাতা রিফাত খান তুষার বলেন,
“স্বল্প জায়গায় নিজের পুষ্টি নিজে উৎপাদন – এই চিন্তা থেকেই আমরা মাইক্রোগ্রিনসকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে আসছি।”
ঘরে চাষ: ধাপে ধাপে সহজ পদ্ধতি
প্রয়োজনীয় উপকরণ:
- ফুড-গ্রেড ট্রে/পাত্র (ছিদ্রযুক্ত)
- মাটি + নারকেলের ছোবড়া কম্পোস্ট (১:১ অনুপাত)
- বীজ (সূর্যমুখী, মুলা, সরিষা, মটরশুঁটি – নতুনদের জন্য সেরা)
- স্প্রে বোতল
চাষের ধাপ:
- পাত্র তৈরি: ২ ইঞ্চি পুরু মাটি-কম্পোস্ট মিশ্রণ বিছিয়ে দিন।
- বীজ ভেজানো: বড় বীজ (সূর্যমুখী/মুলা) এক রাত ভিজিয়ে রাখুন। ছোট বীজ সরাসরি ছিটিয়ে দিন।
- বপন: মাটির উপর ঘন করে বীজ ছড়িয়ে দিন, হালকা মাটি দিয়ে ঢেকে দিন।
- পানি: স্প্রে করে মাটি ভিজিয়ে রাখুন, জমতে দেবেন না।
- আলো: পরোক্ষ সূর্যালোক বা ছায়াযুক্ত জায়গা।
- সংগ্রহ: ৭-১০ দিনে কেটে নিন (মাটি থেকে ১-২ ইঞ্চি উপরে)।
টিপ: গরমে বেশি স্প্রে করুন। কোনো সার-কীটনাশক লাগবে না।
বিশেষজ্ঞদের মত
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল হাসান:
“জমি কমছে, রাসায়নিক বাড়ছে। মাইক্রোগ্রিনস ব্যক্তিগত পুষ্টি নিরাপত্তার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।”
চিফ ডায়েটিশিয়ান নিশাত শারমিন নিশি:
“ফাইবার, ভিটামিন, মিনারেল – রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তবে শিশু ও হৃদরোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খাওয়া উচিত।”
খরচ কেমন?
প্রাথমিক বিনিয়োগ (ট্রে, কম্পোস্ট, বীজ) কিছুটা লাগলেও দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী। একবার সেটআপ করলে বারবার উৎপাদন করা যায়।
কেন খাবেন?
- ১ চা চামচ = ১ কাপ সবজির পুষ্টি
- সালাদ, স্যুপ, স্মুদি, স্যান্ডউইচ – যেকোনো খাবারে মেশান
- সারা বছর, যেকোনো আবহাওয়ায় চাষ সম্ভব
আজই শুরু করুন! একটি ছোট ট্রে, কয়েকটা বীজ – আর আপনার হাতে তৈরি হবে জৈব ‘সুপার ফুড’। পুষ্টি নয়, এ যেন স্বাস্থ্যের ছোট্ট বিপ্লব – ঘরের কোণ থেকে।
Leave a comment