বাংলাদেশে এখনো অনেকেই মনে করেন, স্ট্রোক মানেই স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা অচল জীবন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে সেই ধারণা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে স্ট্রোক থেকে সম্পূর্ণ সেরে ওঠাও সম্ভব।
স্ট্রোক ও আধুনিক চিকিৎসা
স্ট্রোক সাধারণত তখনই হয়, যখন মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রক্তনালিতে রক্তপিণ্ড জমে গেলে (থ্রম্বাস) ওই অংশ অক্সিজেন না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অবস্থাকে বলে ইস্কেমিক স্ট্রোক। এর প্রথম সারির আধুনিক চিকিৎসা হলো আইভি থ্রোম্বোলাইসিস, যেখানে বিশেষ ওষুধ (যেমন এল্টিপ্লেজ বা টেনেকটিপ্লেজ) দিয়ে জমাট রক্ত গলিয়ে দেওয়া হয়।
তবে এই চিকিৎসা কার্যকর তখনই, যদি রোগী স্ট্রোকের সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছান। দেরি হলে ওষুধে আর ফল মেলে না।
বিকল্প পথ—মেকানিক্যাল থ্রোম্বেক্টমি
যদি রোগী দেরিতে আসে, বা বড় রক্তনালীতে রক্তপিণ্ড জমে যায়, তখনও আশা শেষ হয়ে যায় না। তখন করা যায় মেকানিক্যাল থ্রোম্বেক্টমি, যা স্ট্রোক চিকিৎসায় বর্তমানে সবচেয়ে আধুনিক ও কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত।
এটি মূলত এক ধরনের সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচার, যা করা হয় ক্যাথল্যাবে। চিকিৎসক কুচকির রক্তনালী দিয়ে এক বিশেষ ক্যাথেটার মস্তিষ্ক পর্যন্ত নিয়ে যান। সাকশন মেশিনের সাহায্যে জমাট রক্ত টেনে বের করা হয়। কখনো সূক্ষ্ম স্ট্যান্ট ব্যবহার করে রক্তপিণ্ডকে আটকিয়ে টেনে আনা হয়। এতে বন্ধ রক্তনালী খুলে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয়।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই চিকিৎসা
স্ট্রোকে আক্রান্ত অংশের চারপাশে কিছু কোষ থাকে, যেগুলো পুরোপুরি মারা যায় না, বরং অক্সিজেনের অভাবে “ঘুমন্ত” অবস্থায় থাকে। একে বলে পেনামব্রা। যত দ্রুত বন্ধ রক্তনালী খুলে দেওয়া যায়, এই কোষগুলো আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে, ফলে পঙ্গুত্বের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। এজন্যই স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময়কে বলা হয় “ব্রেন ইজ টাইম”।
কখন পর্যন্ত করা যায়
আগে মনে করা হতো, স্ট্রোকের ৬ ঘণ্টার মধ্যে মেকানিক্যাল থ্রোম্বেক্টমি করতে হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে—রোগীর অবস্থা ও মস্তিষ্কের ক্ষতির পরিমাণ দেখে ১৬ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও এই চিকিৎসা কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে এখনো এই পদ্ধতি সীমিত পরিসরে চালু আছে। সরকারি পর্যায়ে কেবল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস (নিনস)-এ নিয়মিত মেকানিক্যাল থ্রোম্বেক্টমি করা হয়। কিছু বেসরকারি হাসপাতালে যেমন বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল ও ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ, অল্প পরিসরে এ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে দক্ষ জনবল, যন্ত্রপাতি ও সচেতনতার অভাব এখনো বড় বাধা।
কেন জনপ্রিয় করা জরুরি
বিশ্বে মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ স্ট্রোক। তাই সরকারিভাবে এ চিকিৎসায় ভর্তুকি দেওয়া ও বিভাগীয় শহরগুলোতে ক্যাথল্যাব স্থাপন জরুরি। সাধারণ মানুষকেও জানাতে হবে—স্ট্রোকের চিকিৎসা আছে, সময়মতো ব্যবস্থা নিলে পঙ্গুত্ব নয়, সুস্থ জীবনই সম্ভব।
সফলতার হার
গবেষণায় দেখা গেছে, মেকানিক্যাল থ্রোম্বেক্টমি করা রোগীদের প্রায় ৫০ শতাংশই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন, এবং মৃত্যুহার নেমে আসে মাত্র ১০ শতাংশে। অর্থাৎ এই চিকিৎসা শুধু জীবন বাঁচায় না, জীবনকে ফিরিয়েও আনে স্বাভাবিক ছন্দে।
Leave a comment