বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংস্কার টেকসই করতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় জরুরি— এমন মত দিয়েছেন ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মধ্যে নিয়মিত সংলাপ ও যৌথ সিদ্ধান্ত ছাড়া আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
আজ সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত “বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার: মূলধন এখন কেন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ অভিমত উঠে আসে। নীতিনির্ধারণী সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ আলোচনাটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সংগঠনের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ।
বক্তারা বলেন, পর্যাপ্ত মূলধনই একটি স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলভিত্তি – যা আমানতকারীদের সুরক্ষা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।
এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, “আমাদের এখনো কোনো জাতীয় বিনিয়োগ কৌশল নেই। ফলে বিনিয়োগ বাড়ানোর পথে নানা বাধা রয়ে গেছে, যার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর মধ্যকার অসামঞ্জস্য থেকে আসে। ব্যাংকভিত্তিক বিনিয়োগ কমিয়ে পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক অর্থায়নের দিকে যেতে হবে। ব্যাংকের মূলধন বাড়াতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নতুন দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।”
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল পরিচালনা ব্যবস্থার কারণে ব্যাংক খাত ঝুঁকিতে পড়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। এখন দরকার কার্যকর সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা।”
প্রাইম ব্যাংক–এর এমডি হাসান ও. রশিদ বলেন, “ব্যাংকে শেয়ারধারণের সীমা বড় সমস্যা নয়; আসল সমস্যা হলো সুশাসনের অভাব। পরিবারভিত্তিক প্রভাব কমাতে একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এক পরিবারের একজনের বেশি সদস্য না থাকাই উচিত।” তিনি আরও বলেন, “খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা দরকার, এবং ব্যাংকের মূলধন বাড়াতে বন্ডের পরিবর্তে শেয়ারবাজার থেকেই অর্থ সংগ্রহ করা উচিত।”
আল–আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক–এর স্বতন্ত্র পরিচালক আবদুল ওয়াদুদ বলেন, “নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে যে শীতল সম্পর্ক বা ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’ রয়েছে, তা বন্ধ হওয়া দরকার। এনআই অ্যাক্টের মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা খেলাপি ঋণ আদায়ে বড় বাধা। স্থানীয় তহবিলের পাশাপাশি বিদেশি উৎস থেকেও কম খরচে মূলধন আনার সুযোগ রয়েছে, সেখানে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।”
সিটি ব্যাংক–এর অতিরিক্ত এমডি মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমরা অতীতে ভালো নীতি অনুসরণ করতাম, কিন্তু ধীরে ধীরে তা থেকে সরে এসেছি। সুদের হারে ‘৬/৯ তত্ত্ব’ চালু করে আমরা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এখন আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে মূলধন কাঠামো ঠিক করতে হবে। দুর্বল ব্যাংকগুলোতে অকার্যকরভাবে মূলধন ঢালা সমাধান নয়।”
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন–এর সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, “মূলধন বাড়াতে সরকারের গ্যারান্টি–নির্ভর বন্ড চালু করা যেতে পারে। তবে অতীতে বন্ডে বিনিয়োগকারীদের খারাপ অভিজ্ঞতা তাদের নিরুৎসাহিত করেছে। এখন বন্ডগুলো ক্লাবভিত্তিক হয়ে পড়েছে – এক ব্যাংকের বন্ড অন্য ব্যাংকই কিনছে, এতে প্রকৃত বাজারচাঞ্চল্য তৈরি হচ্ছে না।”
হোদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানির সিনিয়র পার্টনার এ. এফ. নেছারউদ্দিন বলেন, “ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আংশিকভাবে দায়ী। শুধু ব্যাংক একীভূতকরণ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ প্রতিবেদন, স্বতন্ত্র মূল্যায়ন ও একটি টেকসই মূলধন পুনর্গঠন কাঠামো দরকার।”
শেষ বক্তা হিসেবে আইনজীবী সৈয়দ আফজাল হাসান উদ্দিন বলেন, “খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ধীর ও অকার্যকর। কার্যকর বাণিজ্যিক আদালত গঠন করা গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। যারা অর্থ তছরুপ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কেবল দেওয়ানি নয়, অর্থপাচার ও খেলাপির মামলা দিয়ে শেয়ার বাজেয়াপ্ত করা গেলে ইতিবাচক ফল আসবে।”
Leave a comment