স্বাস্থ্য নিয়ে ভুল ধারণার শেষ নেই। কেউ ভাবে কফি মানেই ঘুমের শত্রু, কেউ আবার বিশ্বাস করে ঘি খেলেই ওজন বাড়ে। কিন্তু যেসব বিষয়কে আমরা বছরের পর বছর “অস্বাস্থ্যকর” ভেবে এসেছি, সেগুলোর কিছু আসলে শরীরের জন্য উপকারীও হতে পারে।
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে—আমাদের ভয়, ধারণা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ফারাক আছে।
চলুন জেনে নিই, এমন সাতটি জিনিস যা খারাপ মনে হলেও আসলে শরীর ও মনের জন্য ভালো।
🥔 ১. আলু
আলুকে অনেকেই “অস্বাস্থ্যকর” ভাবেন, কারণ এটি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা চিপস আকারে তেলে ভেজে খাওয়া হয়। কিন্তু সেদ্ধ বা বেক করা আলু আসলে একেবারে পুষ্টিকর।
গবেষণায় দেখা গেছে, আলু হচ্ছে সবচেয়ে সতেজ রাখা ও তৃপ্তিদায়ক খাবারের একটি। ১০০ গ্রাম বেক করা আলুতে মাত্র ৯৩ ক্যালরি থাকে, যা দ্রুত ক্ষুধা নিবারণ করে কিন্তু অতিরিক্ত ওজন বাড়ায় না।
তাই গভীর তেলে না ভেজে, সেদ্ধ বা বেক করে খান—আলু হতে পারে সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য।
🍿 ২. পপকর্ন
সিনেমা হলের পপকর্ন সাধারণত অতিরিক্ত তেল, লবণ আর ক্যালরিতে ভরা। কিন্তু এয়ার-পপড পপকর্ন বা বাতাসে ফোলানো ভুট্টা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, হালকা মসলায় বানানো ঘরে তৈরি পপকর্ন হলো স্বাস্থ্যকর হোল-গ্রেইন স্ন্যাকস।
এতে ফাইবার থাকে, যা হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস ও ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়।
সিনেমা হলের এক বাক্স পপকর্নে থাকতে পারে ১,০০০ ক্যালরি ও ২,৬৫০ মি.গ্রা. সোডিয়াম—কিন্তু ঘরে বানালে সেই ঝুঁকি অনেক কম।
🥜 ৩. চর্বিযুক্ত খাবার
সব চর্বি খারাপ নয়।
ভালো চর্বি—মনোআনস্যাচুরেটেড ও পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট—মেলে বাদাম, মাছ, বীজ ও জলপাই তেলে। এগুলো হৃদ্রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।
খারাপ চর্বি হলো ট্রান্স ফ্যাট, যা প্রক্রিয়াজাত খাবারে পাওয়া যায়।
আর স্যাচুরেটেড ফ্যাট, যেমন ঘি বা মাখন—পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে, তবে মোট ক্যালরির ১০ শতাংশের বেশি নয়।
🍫 ৪. চকলেট
চকলেট শুনলেই অনেকের মনে “অস্বাস্থ্যকর” শব্দটা আসে, কিন্তু ডার্ক চকলেট (৭০% কোকো বা তার বেশি) আসলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভাণ্ডার।
এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, মন ভালো রাখে এবং হালকা মুড-বুস্টার হিসেবে কাজ করে।
তবে দুধচকলেট বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত চকলেটের পরিবর্তে পরিমিত পরিমাণে ডার্ক চকলেট খাওয়াই শ্রেয়।
🧘♀️ ৫. কিছু না করা
আজকাল সবাই ব্যস্ত—অফিস, ফোন, নোটিফিকেশন, কাজ। কিন্তু মাঝে মাঝে “কিছু না করা” আপনার শরীর ও মনের জন্য ওষুধের মতো কাজ করে।
চুপচাপ বসে থাকা, কোনো পরিকল্পনা না থাকা, শুধু নিশ্বাস নেওয়া—এই নিরব সময়টিই মানসিক পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ধ্যান বা “মাইন্ডফুলনেস” চর্চা করলে স্ট্রেস কমে, মনোযোগ বাড়ে এবং আসক্তি নিয়ন্ত্রণে থাকে।
তাই মাঝেমধ্যে থামুন—কিছু করবেন না, সেটাই হবে সবচেয়ে বড় কাজ।
🪵 ৬. ময়লা হওয়া (বিশেষ করে শিশুদের জন্য)
শিশুদের প্রায়ই বলা হয়—
“মাটি ধরবে না!”, “দৌড়াবে না!”, “দোলনায় চড়বে না!”
কিন্তু এই নিষেধগুলো হয়তো তাঁদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃতির জীবাণুগুলো আসলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা প্রশিক্ষিত করে—শরীরকে শেখায়, অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখাতে।
শহুরে শিশুরা যেহেতু প্রকৃতির সংস্পর্শে কম আসে, তাই তাদের ইমিউন সিস্টেম অতিসংবেদনশীল হয়ে যাচ্ছে।
তাই সন্তানদের মাটিতে খেলতে দিন, একটুখানি ময়লা হোক—তাতেই তাদের শরীরের জন্য ভালো।
🧠 ৭. একঘেয়েমি বা ‘বোর’ লাগা
আজকের আলফা প্রজন্ম “বোর হওয়া” মানেই বিরক্তি বলে মনে করে। কিন্তু গবেষণা বলছে, একঘেয়েমিই অনেক সময় সৃজনশীলতার উৎস।
যখন আমরা বোর হই, তখন মস্তিষ্ক নতুন নতুন চিন্তা করে, সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে পায়।
তাই মাঝে মাঝে প্রযুক্তি থেকে একটু দূরে থেকে কিছু না করে সময় কাটানো দরকার।
কথায় যেমন আছে, “গোসলের সময়ই বুদ্ধি আসে!”
🩺 শেষ কথা
সবকিছুতেই ভারসাম্যই মূল কথা।
যা আমরা অস্বাস্থ্যকর ভেবে এড়িয়ে যাই, সঠিকভাবে গ্রহণ করলে সেটাই হতে পারে সুস্থ জীবনের অংশ।
বিজ্ঞান এখন বলছে—অতিরিক্ত ভয় নয়, জ্ঞানই হোক আপনার স্বাস্থ্যরক্ষার মূলমন্ত্র।
Leave a comment