মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে প্রায়ই বিজ্ঞান, স্থাপত্য বা শাসনব্যবস্থার কথা আলোচিত হয়। কিন্তু এর মানবিক দিক—বিশেষ করে দরিদ্র ও অসুস্থদের প্রতি দয়া এবং চিকিৎসাসেবা—প্রায়শই আড়ালে থাকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মুসলিম সমাজে দরিদ্রদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, আশ্রয় এবং মানসিক সান্ত্বনার ব্যবস্থা ছিল।
বিমারিস্তান: দরিদ্রদের চিকিৎসার আশ্রয়
“বিমারিস্তান” শব্দটি আরবি “বিমার” (রোগী) থেকে এসেছে। মুসলিম সভ্যতায় এটি ছিল শুধুমাত্র হাসপাতাল নয়, বরং দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে আশ্রয়, খাদ্য ও যত্নের ব্যবস্থা।
- দামেস্কে বিমারিস্তানের নাম ছিল ‘নুরি’,
- বাগদাদে ‘আদুদি’।
প্রথম বিমারিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবন আবদুল মালিকের সময়, ৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে, যেখানে চিকিৎসক নিয়োগ ও বেতন নিশ্চিত করা হতো। সমাজের স্বাস্থ্য রক্ষায় কুষ্ঠরোগীদের জন্য পৃথক বিনামূল্যে খাদ্য ও যত্ন প্রদান করা হতো।
উমর ইবন আবদুল আজিজ (রহ.) নির্দেশ দিয়েছিলেন:
“প্রতিটি অন্ধ বৃদ্ধের জন্য এমন একজন সাহায্যকারী নিয়োগ কর, যে তাকে অত্যাচার বা অবহেলা না করে।”
(ইবনে আসাকির, তারিখে দিমাশক, ৪৪/১২৩, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)
ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালও ছিল, যা যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের চিকিৎসার জন্য গড়ে তোলা হতো। দূরবর্তী অঞ্চলে মহামারি মোকাবিলায় ৪০টি উটের কাফেলায় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে যাতায়াত করা হতো।
মিসরে বিমারিস্তান ও সমাজসেবা
- মিসরে প্রথম বিমারিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় আহমদ ইবন তুলুনের সময়, ৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে, ফুসতাতে।
- এর নাম ছিল ‘বিমারিস্তান আতিক’, এবং এটি পরিচালিত হত ওয়াক্ফ তহবিলের মাধ্যমে, শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের জন্য।
- বার্ষিক খরচ ছিল প্রায় ৬০ হাজার দিনার, এবং এতে ১ লাখের বেশি বইয়ের গ্রন্থাগার ছিল।
(মাকরিজি, খিতাত, ২/৪০৫, দারু সাদির, কায়রো, ১৮৫৩)
সুন্দর পরিবেশ এবং মানসিক যত্নের জন্য, রোগীদের ঘরে সুগন্ধি গাছ রাখা হতো, হাতপাখা দেওয়া হতো, এবং রাতের অন্ধকারে রোগীদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য ফজরের আজান আগে দেওয়া হতো। সুস্থ হওয়ার পর রোগীদের পোশাক ও অর্থও দেওয়া হতো।
দরিদ্রদের জন্য চিকিৎসাগ্রন্থ
মুসলিম চিকিৎসকেরা লক্ষ্য করতেন যে, চিকিৎসা প্রায়শই ধনীদের কাছে ব্যবসায় পরিণত হয়। তাই দরিদ্রদের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসাগ্রন্থ রচনা করা হতো।
- আবু বকর আর-রাজি: ‘বুরউ সা’আত’ ও ‘মান লা ইয়াহদুরুহু তাবিব’ রচনা করেছেন।
“অনেক চিকিৎসক ওষুধ ও খাবারের কথা লেখেন, যা শুধু রাজাদের ভান্ডারে পাওয়া যায়। আমি সাধারণ ও সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে চিকিৎসার একটি সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ লিখতে চাই।”
(আল-রাজি, মান লা ইয়াহদুরুহু তাবিব, পৃষ্ঠা ১৫, দারুল কুতুব, বৈরুত, ১৯৮৫)
- ইবনে জাজ্জার কায়রাওয়ানি: কখনো দরিদ্রদের কাছ থেকে চিকিৎসার ফি নিতেন না।
(ইবনে জাজ্জার, তিব্বুল ফুকারা, পৃষ্ঠা ১০, দারুল ফিকর, কায়রো, ১৯৯০) - ইবনে আকফানি: ‘গুনইয়াতুল লাবিব ফি গাইবাতিত তাবিব’ রচনা করেছেন জরুরি রোগের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য রক্ষার পরামর্শের জন্য।
- জামালুদ্দিন ইউসুফ মাকদিসি: ‘তিব্বুল ফুকারা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, দরিদ্রদের জন্য সহজ ও সস্তা ওষুধের গুরুত্ব।
(মাকদিসি, তিব্বুল ফুকারা, পৃষ্ঠা ৮, দারুল মারিফা, বৈরুত, ১৯৯২)
মুসলিম সভ্যতার মানবিক দিক
মুসলিম সভ্যতা কেবল জ্ঞান, বিজ্ঞান বা স্থাপত্যে নয়, মানবিকতা ও দয়াতেও সমৃদ্ধ ছিল। বিমারিস্তান ছিল দরিদ্রদের জন্য আশ্রয়, যেখানে শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা দেওয়া হতো। চিকিৎসকেরা সহজলভ্য গ্রন্থের মাধ্যমে দরিদ্রদের সেবা নিশ্চিত করতেন। এই ঐতিহ্য দেখায়, ইসলামি সভ্যতার মূল ভিত্তি ছিল মানবিক সহমর্মিতা।
Leave a comment