Tuesday , 13 January 2026
শিরোনাম
Home আরও সাহিত্য ও সংস্কৃতি ভাঙারির দোকানি জানতেন না, কী অমূল্য জিনিস তুলে দিলেন আমার হাতে
সাহিত্য ও সংস্কৃতি

ভাঙারির দোকানি জানতেন না, কী অমূল্য জিনিস তুলে দিলেন আমার হাতে

Share
Share

আমরা যখন স্কুলে পড়েছি, তখনো ইন্টারনেট আজকের মতো এতটা বিস্তৃত ছিল না। অন্তত মফস্‌সল শহরে বড় হওয়ায় আমার অভিজ্ঞতায় স্কুলজীবনে ‘মোবাইল’ মানেই ছিল বাটন ফোন। বোধ করি, এ কারণেই অবসর মানে ছিল গল্প–উপন্যাসের জগৎ। এখনকার মতো ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় বড় হলে হয়তো বই পড়ার সেই অভ্যাসটা গড়ে উঠত না।

‘তিন গোয়েন্দা’র স্রষ্টা রকিব হাসান চলে গেছেন ১৫ অক্টোবর। কখনো তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি, কথা হয়নি। তবু তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে মনটা ভার হয়ে গিয়েছিল। চোখে ভেসে উঠছিল কিশোর পাশা, মুসা আমান আর রবিন মিলফোর্ডের সঙ্গে কাটানো সেই কিশোরবেলার দিনগুলো। কবি–লেখকের প্রাপ্তি বোধ হয় এখানেই—নিজের সৃষ্ট চরিত্রের মধ্য দিয়ে তাঁরা পাঠকের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকেন।

কিশোর পাশার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তখন আমি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি, সামনে বৃত্তি পরীক্ষা। প্রতিদিন টিউশনি, কোচিং, মডেল টেস্ট—পড়ার চাপে শ্বাস নেওয়ারও সময় নেই। তবু আমি ‘পড়াচোর’। সুযোগ পেলেই পাঠ্যবইয়ের ভেতর লুকিয়ে গল্পের বই পড়তাম।

এক বিকেলে হঠাৎ ভাঙারির দোকানির আগমনের শব্দ পেলাম—বোতলে গেঁথে রাখা মার্বেলের ঠকঠক আওয়াজ। দৌড়ে বেরিয়ে গেলাম, উদ্দেশ্য বুটভাজা কেনা। তখন দুই টাকায় বেশ ভালো পরিমাণ পাওয়া যেত।

ঠিক সেই সময় চোখে পড়ল পুরোনো কাগজ–খাতার চাঙাড়ির ওপর একটা বই। মলাট ছেঁড়া, ধুলো ধরা, তবু দৃষ্টি আটকে গেল পেছনের লেখায়—

“হ্যালো কিশোর বন্ধুরা—আমি কিশোর পাশা বলছি আমেরিকার রকি বিচ থেকে…”

গোয়েন্দা কাহিনি তখনও পড়া হয়নি, কিন্তু কৌতূহলে পকেটের দুই টাকা বের করে বললাম, “কাকু, এই বইটা নিই?”
দোকানি কাকু হেসে বললেন, “টাকা লাগবে না, নিয়ে নে।”

হয়তো তিনি জানতেন না, তাঁর হাতে সেদিন আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ এসে পড়েছে। বইটি শুধু একটা গল্প ছিল না—সেটি ছিল আমার গোয়েন্দা হওয়ার স্বপ্ন, পাঠক হয়ে ওঠার প্রথম রসদ।

সেই রাতে টিউশনির বই সরিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ে ফেলেছিলাম গোটা বইটা। পরদিন কোচিংয়ে মডেল টেস্টে নম্বর কম পেয়েছিলাম, বাড়ি ফিরে বকাও খেয়েছিলাম। তবু কিশোর পাশার জগৎ তখন আমাকে পুরোপুরি বেঁধে ফেলেছে। এরপর একে একে রকিব হাসানের আরও বই—আর আমি পরিণত হচ্ছিলাম ‘তিন গোয়েন্দা’র অন্ধ ভক্তে।

আমার সূত্রে বন্ধু লিমন আর ইমন (যমজ দুই ভাই)ও ভক্ত হয়ে গেল। আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া হরিহর নদীর তীরে বসে প্রায়ই আমরা বই হাতে বিকেল কাটাতাম। একদিন ইমন বলল, “আমরাও একটা গোয়েন্দা সংস্থা খুলি চল!”
কিন্তু কে কোন চরিত্র হবে—কিশোর, মুসা না রবিন—তা নিয়ে শুরু হলো ঝগড়া। শেষ পর্যন্ত আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা আর খোলা হলো না। তবু ছেলেবেলার আনন্দে কিশোর পাশা, মুসা আর রবিন মিশে ছিলেন প্রাণের মতো।

জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন—

“পৃথিবীর পুরোনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয় / …নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়।”

চিরসত্য এটাই—সবাই একদিন চলে যায়। কিন্তু সৃষ্টিশীল মানুষ তাঁদের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকেন।
রকিব হাসানও থাকবেন—তাঁর কিশোর পাশা, মুসা আর রবিনের হাসি–আড্ডার ভেতর, আমাদের শৈশবের মুগ্ধ বিকেলগুলোর ভেতর।

তাঁর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা—
ছেলেবেলার আনন্দটাকে একটু বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

ঘুষকাণ্ডের অভিযোগে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোতে দুদকের আকস্মিক অভিযান

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রধান কার্যালয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আজ রবিবার হঠাৎ অভিযান চালায়। সংস্থাটির এক উপপরিচালকের বিরুদ্ধে বিদেশি মেলায় অংশগ্রহণকারী ব্যবসায়ীদের...

টানা তিন মাসে রপ্তানি খাতে ধস, তৈরি পোশাকেই বড় ধাক্কা

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎসগুলোর একটি পণ্য রপ্তানি খাত টানা তিন মাস ধরে নিম্নমুখী। অক্টোবর মাসে দেশের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৮২ কোটি...

Related Articles

গবেষণায় বেরিয়ে এল আরবি সাহিত্যের ‘হারানো শতাব্দী’র গল্প

জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় উপস্থাপিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা দীর্ঘদিনের এক প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ...