ইসলামে “নিফাক” এমন এক আধ্যাত্মিক রোগ, যা মানুষের ইমানকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে। এটি দ্বিমুখী আচরণের পরিচয়—বাইরে মুসলমানের রূপে দেখা গেলেও অন্তরে থাকে অবিশ্বাস ও প্রতারণা। নবীজি (স.) নিফাককে সবচেয়ে ভয়ংকর মানসিক ব্যাধি হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা মানুষের ইমানকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে।
নিফাক শব্দের অর্থ
“নিফাক” শব্দটি আরবি “নাফাকা” ধাতু থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো গর্ত করা, আড়াল করা বা দ্বিমুখিতা দেখানো। আরবিতে “নাফাকা” এমন সুড়ঙ্গ বোঝায় যার দুটি মুখ থাকে—এক মুখে প্রবেশ করলে অন্য মুখে বের হওয়া যায়। ঠিক তেমনি, মুনাফিক ব্যক্তি এক মুখে ঈমানের কথা বলে, আর অন্তরে অবিশ্বাস ও প্রতারণা লুকিয়ে রাখে।
কোরআনের দৃষ্টিতে নিফাক
কোরআনে নিফাক অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়েছে।
“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করি,’ অথচ তারা বিশ্বাসী নয়।” (সূরা বাকারা, আয়াত ৮)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন:
“নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আগুনের নিম্নতম স্তরে থাকবে, আর তুমি তাদের জন্য কোনো সহায়ক পাবে না।” (সূরা নিসা, আয়াত ১৪৫)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, নিফাক এমন গুরুতর অপরাধ, যার জন্য জাহান্নামের সবচেয়ে নীচে শাস্তি নির্ধারিত।
নিফাকের প্রকারভেদ
ইসলামী পণ্ডিতরা নিফাককে দুই ভাগে ভাগ করেছেন—
১. নিফাক ইতিকাদি (অবিশ্বাসমূলক নিফাক): যেখানে অন্তরে অবিশ্বাস থাকে কিন্তু মুখে ঈমান প্রকাশ করা হয়। এটি কুফরের একটি রূপ।
২. নিফাক আমলি (কর্মগত নিফাক): যেখানে ইমান থাকলেও আচরণে মুনাফিকি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। উদাহরণ: মিথ্যা বলা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা, আমানত ভঙ্গ করা। (ইমাম নববি, শারহ সহিহ মুসলিম, ২/৪৬, দারুল হাদিস, কায়রো)
মুনাফিকের তিনটি লক্ষণ
সহিহ হাদিসে নবীজি (স.) বলেছেন:
“মুনাফিকের তিনটি লক্ষণ আছে: যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে; যখন প্রতিশ্রুতি দেয়, তা ভঙ্গ করে; এবং যখন আমানত রাখা হয়, তা খিয়ানত করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৯)
এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই নিফাক আমলির প্রতিফলন।
তিনটি লক্ষণের বিশ্লেষণ
১. মিথ্যা বলা: মিথ্যা ইসলামি নৈতিকতার পরিপন্থী। নবীজি (স.) বলেছেন:
“সত্য মানুষকে নেকির দিকে নিয়ে যায়, আর মিথ্যা নিয়ে যায় পাপের দিকে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬০৭)
২. প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা: আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সূরা ইসরা, আয়াত: ৩৪)
৩. আমানতের খিয়ানত করা: নবীজি (স.) বলেছেন:
“যার মধ্যে আমানত নেই, তার ইমানও নেই।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১২৫৬৫)
মুনাফিকির সামাজিক প্রভাব
নিফাক শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পাপ নয়, এটি সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হয়। একজন মুনাফিক সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, কারণ সে কখনও স্পষ্ট অবস্থান নেয় না। কোরআনে বলা হয়েছে:
“তারা প্রতিটি দলের সঙ্গেই যায়; এক দল সফল হলে বলে—আমরা তো তোমাদের সঙ্গে ছিলাম।” (সূরা হাশর, আয়াত: ১১)
অর্থাৎ, মুনাফিক ব্যক্তি সর্বদা সুবিধাবাদী, তার কোনো আদর্শ বা সত্যনিষ্ঠ অবস্থান থাকে না।
ইসলামী পণ্ডিতদের বিশ্লেষণ
- ইমাম গাজালি (রহ.): “নিফাকের মূল হলো হৃদয়ের দ্বৈততা; বাহিরে আল্লাহর আনুগত্য, ভেতরে নিজের স্বার্থের আনুগত্য।” (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ৩/৫৮, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৯২)
- ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.): “মুনাফিক এমন ব্যক্তি, যার জিহ্বা বিশ্বাস করে, কিন্তু হৃদয় অস্বীকার করে।” (আয-যাদুল মা‘আদ, ৪/৩৮৪, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০৩)
নিফাক থেকে বাঁচার উপায়
১. নিয়মিত আত্মসমালোচনা করা—আমি কি কথায় বা কাজে দ্বিমুখী আচরণ করছি?
২. আমানত রক্ষা ও সত্যবাদিতায় অটল থাকা।
৩. দোয়া করা:
“আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল নিফাকি ওয়াশ শিরকি ওয়াল কুফরি।”
অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি আপনার আশ্রয় চাই নিফাক, শিরক ও কুফর থেকে।”
নিফাক বা মুনাফিকি ইসলামি সমাজের জন্য এক নীরব ব্যাধি। এটি কেবল ইমান ধ্বংস করে না, বরং সমাজের বিশ্বাস ও বন্ধনকেও দুর্বল করে দেয়। সত্যবাদী, আমানতদার ও প্রতিশ্রুতিশীল ব্যক্তি প্রকৃত ইমানদার। নবীজি (স.) বলেছেন:
“যার মধ্যে মুনাফিকির বৈশিষ্ট্য আছে, সে যতক্ষণ তা পরিত্যাগ করে না, ততক্ষণ পর্যন্ত মুনাফিকই থাকে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪)
Leave a comment