রাজধানী ও আশপাশে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শোক ও ক্ষোভের পাশাপাশি উঠে আসছে দায়হীনতার প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তাদের সুপারিশ বাস্তবায়ন না করায় একই ভুল বারবার ঘটছে।
বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া মনে করেন, “তদন্তের পর প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন না করলে কোনো দুর্ঘটনাই প্রতিরোধ সম্ভব নয়।”
অবহেলা আর অপ্রস্তুতি
সম্প্রতি মিরপুরের কেমিক্যাল গুদামে আগুনে ১৬ জনের মৃত্যু এবং বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ড—এই দুই ঘটনায় একই চিত্র দেখা গেছে: অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ঘাটতি ও কর্তৃপক্ষের অপ্রস্তুতি। রাজিয়া বলেন, “অগ্নিনিরাপত্তার মূলনীতি হলো কম্পার্টমেন্টালাইজেশন—এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় আগুন ছড়ানো রোধ করা। কিন্তু আমাদের গুদামগুলোতে চুরি ঠেকাতে তালা-চাবি আছে, আগুন ঠেকাতে নেই।”
রাসায়নিক গুদামের অরাজকতা
২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, “পুরান ঢাকায় প্রায় ২৫ হাজার কেমিক্যাল গুদামের মধ্যে ২২ হাজারই অবৈধ।” এসব গুদামের বেশির ভাগই লাইসেন্সবিহীন, ফলে কর্তৃপক্ষ জানেই না কোথায় কী ধরনের রাসায়নিক রাখা আছে।
রাজিয়ার মতে, “আমরা বৈধ ব্যবসা কঠিন করেছি, আর অবৈধ ব্যবসাকে সহজ করে দিয়েছি।” ১৫–২২টি দপ্তরের অনুমোদন নিতে হয় বলেই ব্যবসায়ীরা অবৈধ পথে চলে যাচ্ছেন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমাবদ্ধতা
তিনি বলেন, “নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অনেকেরই আইনগত ক্ষমতা নেই। তারা অনিয়মের চিঠি দিতে পারে, কিন্তু ব্যবসা বন্ধ করতে গেলে শ্রম আদালতে মামলা করতে হয়, যা বছরের পর বছর চলে।”
তদন্তে সুপারিশ, বাস্তবায়নে শূন্যতা
চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর রাসায়নিক গুদাম সরানোর সুপারিশ করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। রাজিয়া বলেন, “শ্যামপুরে অস্থায়ী গুদাম করা হয়েছিল, কিন্তু সেটিও এখন অব্যবহৃত। সিরাজদীখানে স্থায়ী গুদাম প্রকল্পের কাজও শেষ হয়নি।”
সমন্বয়ের অভাব বড় বাধা
বিভিন্ন সংস্থার আংশিক ক্ষমতার কারণে কেউই পূর্ণ দায় নেয় না। রাজিয়া মনে করেন, এখন সময় এসেছে জাতীয় রাসায়নিক সমন্বয় কমিটি গঠনের, যা রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা তদারকির জন্য একক দায়িত্ব পালন করবে।
নাগরিক সচেতনতার আহ্বান
অধ্যাপক রাজিয়া বলেন, “অবৈধ রাসায়নিক ব্যবসা শুধু সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করছে না, বরং জনগণের জীবন ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। আইন মেনে ব্যবসা করলে দুর্ঘটনা অনেকটাই রোধ করা সম্ভব।”
Leave a comment