জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় উপস্থাপিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা দীর্ঘদিনের এক প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এত দিন মনে করা হতো, আব্বাসীয় আমলের (৭৫০–১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) পর প্রায় আট শতাব্দী ধরে আরবি সাহিত্য স্থবির ছিল। কিন্তু ভাষাবিদ ও সাহিত্য ইতিহাসবিদেরা বলছেন, এই ধারণা আসলে পশ্চিমা দৃষ্টিকোণ থেকে তৈরি এক ‘ঔপনিবেশিক কল্পনা’, বাস্তবে আরবি সাহিত্য কখনোই থেমে যায়নি।
পশ্চিমা ইতিহাসের ভুল পাঠ
অষ্টম শতাব্দীতে আব্বাসীয় খলিফাদের অধীনে বাগদাদ হয়ে উঠেছিল বিজ্ঞান, দর্শন ও কবিতার কেন্দ্র। আবু নুয়াস, আল–মুতানাব্বি, আল–ফারাবি ও ইবনে সিনার মতো মনীষীর হাতে শুরু হয়েছিল এক স্বর্ণযুগ।
ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় গবেষকেরা—যেমন ফরাসি চিন্তাবিদ আর্নেস্ট রেনাঁ ও ডাচ ইতিহাসবিদ রেইনহার্ট দোজি—এই সময়টিকেই আরবি বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের চূড়া বলে ধরে নিয়েছিলেন। তাঁদের মতে, একাদশ শতাব্দীর পর এই ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে, এবং রেনেসাঁর আগে পর্যন্ত আরবে কোনো উল্লেখযোগ্য সাহিত্য বা দার্শনিক সৃষ্টিই হয়নি।
নতুন গবেষণার পাল্টা ব্যাখ্যা
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় শেখ জায়েদ বুক অ্যাওয়ার্ডের আয়োজিত আলোচনায় আধুনিক গবেষকেরা দাবি করেছেন, এই ধারণা সরলীকৃত ও পক্ষপাতদুষ্ট। আরবি সাহিত্য কখনোই থেমে ছিল না—বরং কপি, অনুবাদ ও পাঠের ধারার মধ্য দিয়ে টিকে থেকেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।
জার্মান গবেষক বেয়াট্রিস গ্রুন্ডলার তাঁর বই The Rise of the Arabic Book-এ দেখিয়েছেন, আরবি সাহিত্যে ‘হারানো শতাব্দী’ বলে যে ধারণাটি প্রচলিত, তা মূলত এক পশ্চিমা মিথ। নবম শতাব্দীর বাগদাদে বইয়ের ব্যবসা, কপিকারদের প্রতিযোগিতা, জনসম্মুখে পাঠ ও লেখার সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে তখনই তৈরি হয়েছিল আধুনিক প্রকাশনা শিল্পের পূর্বসূরি।
গ্রুন্ডলারের ভাষায়,
“বাগদাদের রাস্তায় হাঁটলে দেখা যেত মানুষ হস্তলিপি বিক্রি করছে, বিরামচিহ্ন নিয়ে তর্ক করছে—এ যেন এক জীবন্ত প্রকাশনা বাজার।”
তাঁর এই বইটি এবারের শেখ জায়েদ পুরস্কারের শর্টলিস্টে স্থান পেয়েছে।
ধারাবাহিকতার প্রমাণ
গবেষকেরা বলছেন, আরবি সাহিত্য কখনো এক জায়গায় স্থির ছিল না—তার কেন্দ্র কেবল স্থানান্তরিত হয়েছে। বাগদাদ থেকে কায়রো, দামেস্ক ও আন্দালুসিয়ায় গিয়েছে সাহিত্যচর্চার ধারা। নতুন ঘরানা তৈরি হয়েছে, পুরোনো ঘরানা রূপান্তরিত হয়েছে।

ফরাসি অধ্যাপক হাকান ওজকান তাঁর গবেষণায় ‘জাজাল’ নামের কথ্য ছন্দভিত্তিক কবিতার ধারা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, আব্বাসীয় যুগের পরও এই কবিতাশৈলী টিকে ছিল এবং বিকশিত হয়েছে। তাঁর মতে,
“এই কবিরা নিয়ম ভেঙে নতুন রূপ দিয়েছে—তাদের ছন্দ ও ব্যঙ্গ আধুনিক র্যাপ সংগীতের মতো প্রাণবন্ত।”
পুনরাবিষ্কারের প্রয়াস
আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল-এর এক প্রতিবেদনে জানা যায়, আবুধাবির নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ‘আরবি সাহিত্য লাইব্রেরি’ প্রকল্প ইতিমধ্যেই তথাকথিত ‘হারানো শতাব্দী’র সময়ের ৬০টিরও বেশি সাহিত্যকর্ম পুনরুদ্ধার করেছে।
প্রকল্পের সম্পাদক অধ্যাপক মরিস পোমেরান্টজ বলেন,
“এই পাণ্ডুলিপিগুলো সম্পাদনা করা মানে এক চলমান সংলাপে অংশ নেওয়া—যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম লেখক, অনুবাদক ও সমালোচকেরা একে অপরকে উত্তর দিয়ে গেছেন।”
তাঁর মতে, আরবি সাহিত্য স্থবির হয়ে পড়ার ধারণার মূল কারণ অনুবাদের ঘাটতি।
“যখন কোনো লেখা অনুবাদ করা হয় না, তখন সেটি বৈশ্বিক অস্তিত্ব হারায়,”—বলেছেন মরিস।
‘হারানো শতাব্দী’ নয়, অবিচ্ছিন্ন যাত্রা
এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই সাহিত্যকে আবার জনসাধারণের কল্পনায় ফিরিয়ে আনা—স্কুলের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা, মঞ্চে উপস্থাপন করা এবং বিশ্বভাষায় অনুবাদ করা।
তবেই বোঝা যাবে, আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে কোনো ‘হারানো শতাব্দী’ নেই—আছে কেবল অবিচ্ছিন্ন সৃজনযাত্রার দীর্ঘ ইতিহাস।
Leave a comment