আফ্রিকার সাহারা অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারকারী জিহাদি সংগঠন জামা’আত নুসরাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন (জেএনআইএম) ধীরে ধীরে মালির রাজধানী বামাকোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল, জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত এবং আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।
আফ্রিকার সাহারা অঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী জিহাদি সংগঠন জামা’আত নুসরাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন (জেএনআইএম) মালির রাজধানী বামাকোর দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে জেএনআইএমের হামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন তারা শুধু সেনাবাহিনীর বহরকে লক্ষ্য করছে না, বরং রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক রুটও ব্লক করছে।
জেএনআইএম যোদ্ধারা মূলত জ্বালানি ট্যাংকার চলাচলের রুট অবরোধ করেছে, যার কারণে বামাকোসহ মালির বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানীতে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় থমকে গেছে, দোকানপাট ও সুপারমার্কেট বন্ধ এবং স্কুলগুলো অন্তত ৯ নভেম্বর পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে।
যদি জিহাদিদের অগ্রগতি থামানো না যায়, তাহলে মালি সম্ভাব্যভাবে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হতে পারে, যেখানে কঠোর শরিয়াহ আইন কার্যকর হবে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, এটি হতে পারে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে বিদ্যমান জিহাদি ক্রমবর্ধমান শক্তির অংশ।
আন্তর্জাতিক সতর্কতা ও প্রভাব:
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর মালিতে অবস্থানরত তাদের নাগরিকদের জন্য এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বার সতর্কতা জারি করেছে। তারা অবিলম্বে বাণিজ্যিক ফ্লাইট ব্যবহার করে দেশ ত্যাগের পরামর্শ দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও ইতালিও তাদের নাগরিকদের দ্রুত দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশটির পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে। এটি হবে পাঁচ বছরের মধ্যে তৃতীয় সফল অভ্যুত্থান এবং ১৯৬০ সালের স্বাধীনতার পর ষষ্ঠ অভ্যুত্থান।
জিহাদি গোষ্ঠী ও মানবাধিকার পরিস্থিতি:
জেএনআইএম ইতিমধ্যেই নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পোশাক ও আচরণগত বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ‘ন্যায়সংগত বিচার মানদণ্ড মানে না’।
সাংবাদিক ও বিশ্লেষকদের মতে, জেএনআইএমের লক্ষ্য আফগানিস্তান ও সিরিয়ার মতো একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। অপহরণ, হত্যাকাণ্ড এবং মুক্তিপণ আদায় করে তারা ন্যাশনাল ও আঞ্চলিক বিস্তার বাড়াচ্ছে, বেনিন ও নাইজেরিয়া পর্যন্ত।
স্থানীয় সরকারের দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা:
মালির জান্তা সরকার বর্তমানে ক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। তারা বুরকিনা ফাসো ও নাইজারের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার চুক্তি করলেও কার্যকর ফলাফল এখনো দেখা যায়নি। ইকোভাসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ায় সামরিক সহায়তাও কমে গেছে।
সেনাবাহিনীর মধ্যেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। প্রথম অভ্যুত্থানে জড়িত পাঁচ কর্নেলের মধ্যে দুজন—মালিক দিয়াও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাদিও কামারা—পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
বিদেশে নির্বাসনে থাকা ইমাম মাহমুদ দিকো দেশে ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু জেএনআইএম সদস্য চান, তিনি দেশে ফিরে আসুক এবং সরকারকে প্রতিস্থাপন করার উদ্দেশ্যে আলোচনা চালাক।
বিশ্লেষক মন্তব্য:
উলফ লেসিং, জার্মান থিঙ্কট্যাংক কোনরাড আদেনায়ের সাহেল প্রোগ্রামের প্রধান, বলেন, “পরবর্তী সপ্তাহটি হবে বর্তমান জান্তার জন্য অত্যন্ত নির্ধারণী। রাজধানীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পুনরায় সরবরাহের উপায় দেখা যাচ্ছে না।”
সাবেক মন্ত্রী একাধিক গণমাধ্যমকে বলেছেন, “দেশটা আমাদের চোখের সামনে ধসে পড়ছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ক্ষমতার আরেকটি রদবদল হবে বলে আমি অবাক হব না।”
ফলাফল ও ভবিষ্যৎ প্রভাব:
- মালির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি মারাত্মক।
- বিদ্যুৎ, খাদ্য ও সাধারণ জীবনধারা সংকটে।
- জিহাদি গোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সম্পূর্ণ সাহেল অঞ্চলে domino effect তৈরি করতে পারে।
- আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সতর্ক, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ সীমিত।
মালির পরিস্থিতি বর্তমানে আন্তর্জাতিক নজরকেন্দ্রে। দেশটি যদি জিহাদি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে পশ্চিম আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও জঙ্গি শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জেএনআইএমের অগ্রগতি এবং মালির সরকারী দুর্বলতা দেশটিকে একটি গভীর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সতর্কতা ও স্থানীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি অবস্থা এমনই থাকে, তাহলে মালিকে একটি ইসলামি রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার জিহাদি লক্ষ্য খুব শীঘ্রই বাস্তবায়িত হতে পারে।
Leave a comment